জুলাই চেতনায় গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ: জুলাই শহিদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান আরপিএমপি, পুলিশ কমিশনারের
প্রকাশের সময়: 06 Aug, 2026

জুলাই চেতনায় গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ: জুলাই শহিদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান আরপিএমপি, পুলিশ কমিশনারের

রংপুর, ৫ আগস্ট ২০২৬ খ্রি.


“জুলাই চেতনায় গড়বো দেশ-সবার আগে বাংলাদেশ” প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬ উপলক্ষে জুলাই শহিদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাগণের সংবর্ধনা ও আলোচনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।


আজ ৫ আগস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে জেলা শিল্পকলা একাডেমি অডিটোরিয়াম, রংপুরে জেলা প্রশাসন, রংপুরের আয়োজনে এ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের পুলিশ কমিশনার জনাব মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বক্তব্য প্রদান করেন।


বক্তব্যের শুরুতেই পুলিশ কমিশনার জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী সকল শহিদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। একই সঙ্গে তিনি জুলাই শহিদ পরিবারের সদস্য, আহত ও জীবিত জুলাই যোদ্ধাদের প্রতি সম্মান ও শুভকামনা জানান।


পুলিশ কমিশনার বলেন, “আজ আমি পুলিশ কমিশনার হিসেবে যে দায়িত্বে দাঁড়িয়ে আছি, তার পেছনে এ দেশের মানুষের ত্যাগ, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস রয়েছে। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদ ও আহতদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ও দায়বদ্ধতা রয়েছে।”

তিনি উল্লেখ করেন, সরকারি গেজেটে এ পর্যন্ত ৮৩৪ জন জুলাই শহিদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৩৫ জন শিশু শহিদ। শিশুদের এমন আত্মত্যাগ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের গভীরতা ও ব্যাপকতা তুলে ধরে। তিনি রংপুরের শহিদ আবু সাঈদ, চট্টগ্রামের শহিদ ওয়াসিম আকরামসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী সকল শহিদকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

পুলিশ কমিশনার বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহিদদের মধ্যে শিশুদের আত্মত্যাগ বিশেষভাবে হৃদয়বিদারক। তিনি সবচেয়ে কম বয়সী শিশু শহিদ হিসেবে গর্ভে থাকা শিশুসহ চার বছর বয়সী শিশু শহিদ আহাদ এবং নারী শিশু শহিদ রিয়া গোপের কথাও উল্লেখ করেন। তাঁদেরসহ সকল শিশু শহিদের আত্মত্যাগ জাতির ইতিহাসে গভীরভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি আরও বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের বিভিন্ন শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং আহত জুলাই যোদ্ধাদের সংখ্যা উল্লেখ করে তাঁদের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্বের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “জুলাই যোদ্ধাদের অবদানকে কেবল একটি দিবসের আনুষ্ঠানিকতা বা সংবর্ধনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। তাঁদের এবং তাঁদের পরিবারের পাশে বাস্তব ও কার্যকরভাবে দাঁড়াতে হবে।”

জুলাই শহিদ ও যোদ্ধা পরিবারের কল্যাণে কর্মসংস্থান ও অন্যান্য সুযোগ সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করে পুলিশ কমিশনার বলেন, তিনি রংপুরে দায়িত্ব গ্রহণের পর জুলাই শহিদ ও যোদ্ধা পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছেন। ভবিষ্যতে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের আওতাধীন কোনো আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হলে প্রচলিত বিধি-বিধান অনুসরণ করে যোগ্য জুলাই যোদ্ধা ও শহিদ পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

তিনি বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন, রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “যেসব প্রতিষ্ঠানে জনবল নিয়োগের সুযোগ রয়েছে, সেখানে প্রচলিত আইন ও বিধি-বিধানের আলোকে জুলাই যোদ্ধা ও শহিদ পরিবারের সদস্যদের জন্য সুযোগ সৃষ্টির বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা যেতে পারে।”

পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, পুলিশের বিভিন্ন নিয়োগ প্রক্রিয়ায়ও প্রচলিত বিধি-বিধানের আওতায় জুলাই যোদ্ধা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের জন্য সম্ভাব্য সুযোগ সৃষ্টির বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রংপুরবাসীর ভূমিকার প্রশংসা করে পুলিশ কমিশনার বলেন, রংপুরের মানুষের আত্মত্যাগ ও সক্রিয় অংশগ্রহণ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের মামলা, হামলা, কারাবরণ ও বিভিন্ন প্রতিকূলতার কথাও তিনি স্মরণ করেন।

তিনি রংপুরের দেশে-বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “রংপুর আমাদের শেকড়। এই শেকড়ের সঙ্গে আমাদের দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা রয়েছে। রংপুরের জুলাই শহিদ ও যোদ্ধা পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হবে আন্তরিকভাবে। তাঁদের সহযোগিতা যেন কোনো প্রচার বা ব্যক্তিগত স্বার্থের বিষয় না হয়; বরং মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই তাঁদের পাশে দাঁড়াতে হবে।”

অনুষ্ঠানে সাম্প্রতিক সামাজিক ও শিক্ষাঙ্গনের পরিস্থিতি নিয়েও বক্তব্য দেন পুলিশ কমিশনার। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতা যে ঐক্য, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সংহতি প্রদর্শন করেছিল, তা ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি। স্বার্থগত বিভাজন যেন সেই ঐক্যকে দুর্বল না করে, সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শান্তিপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে মতপার্থক্য বা প্রতিযোগিতা থাকতে পারে। তবে শিক্ষাঙ্গনে বহিরাগতদের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই কাম্য নয়। শিক্ষার্থীদের নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সকলকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

তিনি ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপমানজনক প্রচারণা কিংবা এমন কোনো কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে হবে, যা শিক্ষাঙ্গনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিঘ্নিত করতে পারে।

পুলিশ কমিশনার বলেন, “শিক্ষার্থীরা আমাদের সন্তানসম। তাঁদের নিরাপদ ও সুন্দর শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। মতপার্থক্য থাকলেও তা যেন সংঘাত বা সহিংসতায় রূপ না নেয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।”

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা নিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, এই চেতনাকে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সংগঠনের একক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। জুলাই ছিল সর্বস্তরের ছাত্র-জনতার সম্মিলিত অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগের প্রতিফলন। তাই জুলাইয়ের ইতিহাস ও চেতনাকে ধারণ করে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে হবে।

তিনি বলেন, “জুলাই কারও একার নয়, জুলাই আমাদের সকলের। এই চেতনাকে সামনে রেখে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে অন্যায়, অনিয়ম, বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতা থেকে দূরে থাকা এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে রাষ্ট্র ও সমাজের কল্যাণে কাজ করা।”

তিনি আরও বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যেমন জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল, তেমনি জুলাইয়ের আত্মত্যাগ থেকেও আমাদের দায়িত্বশীলতা, মানবিকতা ও দেশপ্রেমের শিক্ষা নিতে হবে। জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সকলকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে পুলিশ কমিশনার জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী সকল শহিদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং জুলাই শহিদ পরিবার, আহত ও জীবিত জুলাই যোদ্ধাদের সুস্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও কল্যাণ কামনা করেন।

তিনি বলেন, “শহিদ ও জুলাই যোদ্ধা পরিবারের প্রতি সম্মান জানানোর সর্বোত্তম উপায় হলো তাঁদের পাশে দাঁড়ানো, তাঁদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং তাঁদের আত্মত্যাগের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা। জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করে আমরা রংপুরকে আরও এগিয়ে নিতে চাই এবং সবার আগে বাংলাদেশকে একটি উন্নত, শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।”

 অনুষ্ঠানে জুলাই শহিদ পরিবারের সদস্য, জুলাই যোদ্ধা, বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।


মিডিয়া সেল

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরপিএমপি), রংপুর